Logo

দেশের মোবাইল কোম্পানি গুলোর উপর অতিষ্ঠ গ্রাহকরা

মো. সিরাজুল মনির চীফ রিপোর্টার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ জুলাই, ২০২১

যখন তখন কল ও এসএমএস দিয়ে গ্রাহকদের বিরক্ত করা বেসরকারি মোবাইল অপারেটর রবির বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর সাথে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো যুক্ত হয়েছে ব্যালেন্স থেকে টাকা কেটে নেওয়ার বিষয়। কোনো কারণ ছাড়াই মুহূর্তেই মোবাইল একাউন্ট থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে ১০,২০ বা ৫০ এর বেশি টাকা।

আর এসব বিষয়ে অভিযোগ করেও প্রতিকার না পেয়ে অপারেটর পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন গ্রাহকরা। এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে প্রতি দিন কয়েক কোটি টাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ বিটিআরসিসহ সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষ। তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের দাবি আইনি জটিলতার কারণে এসব অভিযোগের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো সমাধানে আসতে পারছেন না তারা।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) হিসাব মতে, বর্তমানে সারাদেশে রবির গ্রাহক ৪ কোটি ৮৮ লাখ ৩৩ হাজার। এরমধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই আছে রবির ২ কোটি অধিক গ্রাহক। প্রতি গ্রাহক থেকে ১০ টাকা করে কেটে নিলেও কোম্পানিটি দৈনিক চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে যাচ্ছে ২০ কোটি টাকা। এ হিসেবে মাসে কোম্পানিটি এই অঞ্চল থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে গ্রাহকের ৬০০ কোটিরও অধিক টাকা। অথচ ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে দৈনিক ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কেটে নেয়ার অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রামের গ্রাহকরা।

মনির নামের রবির ০১৮১৯….৮০৯ নম্বরের এক গ্রাহক বলেন, আমার মোবাইল থেকে দৈনিক কয়েকধাপে ১০ থেকে ১২ টাকা কেটে নেয়। প্রতিবারই একটি এসএমএস’র মাধ্যমে ২.৫০ টাকা নিয়ে যায়। পরে এসএমএসটি চেক করতে গেলে তা আর ইনবক্সে পাওয়া যায়না। এবিষয়ে কয়েকবার রবির গ্রাহক সেবা অফিসে যোগাযোগ করেও কোন প্রতিকার পাইনি। তারা বলেন, অফিস থেকে কোন সমস্যা নেই। পরে উপায় না দেখে সিমটি আমি বন্ধ করে দিয়েছি।

নাহার নামের রবির ০১৮১৮৭….২৩ আরেক গ্রাহক বলেন, একদিন এশার নামাজে দাঁড়িয়েছি, ফোন বন্ধ করতে মনে ছিলনা। হঠাৎ রিংটোন বেজে উঠে, আমি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাই। তাছাড়া দেখা যায়, অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের সময়ও হঠাৎ রিং বেজে উঠে। রিসিভ করলেই শুনা যায় গান চলছে, কখনো আবার নানান অফারের খবর শোনানো হচ্ছে। এভাবে প্রতিনিয়ত গ্রাহকদেরকে বিরক্ত করছে রবি। শুধু তা নয় হঠাৎ করে মোবাইলের ব্যালেন্স থেকে টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর চট্টগ্রাম অফিসের তথ্যমতে, ২০১৮ থেকে এই পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা অফিসে মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ৩১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এরমধ্যে শুধু রবি কোম্পানির বিরুদ্ধে জমা পড়েছে ২০টি অভিযোগ। এছাড়া এয়ারটেল ৪, বাংলালিংক ৪ ও গ্রামীণ’র বিরুদ্ধে ৩টি অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ করেছেন সচেতন গ্রাহকরা। চট্টগ্রামের প্রতিটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানির প্রতারণার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা বিষয়ে সচেতন হলে এর পরিমাণ কয়েক হাজারে দাঁড়াতো বলে জানান জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদফতর চট্টগ্রামের অফিসের একটি সূত্র।

এদিকে ভোক্তার হয়রানি হলে তার প্রতিকার বা সমাধানের দায়িত্ব জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের হলেও আইনি বাধায় তা করতে পারছেনা প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৭ সালের মে মাসে হাইকোর্টে রবি কোম্পানির করা একটি রিট পিটিশনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৭০ ধারা আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন আদালত। ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ওই পিটিশনটির এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি গ্রামীণ, রবি, বাংলালিংক ও এয়ারটেল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টেলিটক ইচ্ছেমতো গ্রাহকদের হয়রানি ও প্রতারণা করে আসছে। ইন্টারনেট গতি যেন থমকে থাকে প্রায় সারাদিন। অনলাইন নিউজ পোর্টাল গুলো ইন্টারনেট ধীরগতির কারণে সংবাদ প্রকাশ করতে পারছেনা ঠিকসময়ে।

সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৭ সালের ২৭ মে পর্যন্ত ভুক্তভোগীর অভিযোগে মোবাইল কোম্পানিগুলোকে ১০ লাখ টাকার বেশি জরিমানা করতে পারতো বিটিআরসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ । এরমধ্যে এক গ্রাহকের অভিযোগে রবিকে জরিমানা করা হয় ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। আইন অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগী অভিযোগকারী পান জরিমানাকৃত অর্থের ২৫ ভাগ। সে হিসেবে ওই অভিযোগকারী পেয়েছিলেন ১ লাখ ২ হজার ৫০০ টাকা। এরপরই রবি কোম্পানি হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (রিট পিটিশন নং ৬৮৯৫/২০১৭) দায়ের করে। ওই পিটিশনের ফলে হাইকোর্ট বিভাগ রবিসহ টেলিকম কোম্পনি সম্পর্কিত ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পতিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৭০ ধারা আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন, যা এখনো ঝুলে আছে। ফলে এর পর থেকে অদ্যবদি মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে পারেনি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

এবিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের সভাপতি এসএম নাজের হোছাইন বলেন, আমি নিজেও একজন গ্রাহক। টাকা কেটে নেয়া, যখন তখন কল ও এসএমএস সত্যিই বিব্রতকর।

তিনি আরো বলেন, মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলো প্রতারণার জন্য অনেকটা দায়ি বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) কর্মকর্তারা। তারা গ্রাহকদের অভিযোগকে প্রধান্য না দিয়ে মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোকে প্রাধান্য দেন। তাই এই সমস্যাটি হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জমান বলেন, মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি কর্তৃক হাইকোর্টে করা রিট পিটিশনের নিষ্পত্তি না হওয়ায় আমরা কোন অভিযোগের সমাধান করতে পারছিনা। তাই অভিযোগগুলো ঝুলে আছে। আশা করছি রিট পিটিশনটি দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) উপ-পরিচালক (মিডিয়া) জাকির হোসাইন খাঁন বলেন, আমরা গ্রাহকদের অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। তাদের অভিযোগ শুনার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে একটি নম্বর (১০০) দেয়া আছে। এখানে কল করে সবাই অভিযোগ করতে পারে। অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিই।

বিটিআরসি মোবাইল ফোন অপারেটরের পক্ষে কাজ করেন এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো লাইসেন্স নিয়েছে ব্যবসা করতে। ব্যবসা করার সুযোগ তাদেরকে দিতে হবে। এটা আমাদের প্রধান প্রায়োরিটি। এদের সেবাগুলো গ্রাহক পাচ্ছে কিনা সেটা দেখা আমাদের সেকেন্ড প্রায়োরিটি। তবে কেউ অভিযোগ করে সমাধান না পেলে এমন কথা আসতে পারে বলেও জানান বিটিআরসির এই কর্মকর্তা


More News Of This Category
Theme Created By Tarunkantho.Com