Logo

দেড়শ বছরের পুরনো: বাবার হাত হয়ে দায়িত্ব এখন সন্তানদের হাতে

মাহফুজুর রহমান, কালীগঞ্জ, গাজীপুর
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জুলাই, ২০২১
দেড়শ বছরের, পুরনো,বাবার হাত, দায়িত্ব, সন্তানদের হাতে,

গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের জনবহুল একটি গ্রাম ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া। ঈদ-উল-আযহার পশু কোরবানির পর দুপুর থেকে এ গ্রামে চলে এ মাংস ভাগাভাগির কাজ। পৌর শহরের ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামে প্রায় দেড়শ বছর ধরে চলছে এই সামাজিক কোরবানির মাংস তৈরি ও বিতরণের কাজ। স্থানীয় ধনী-গরিব সবাই এই মাংসের অংশীদার। কোরবানি দেওয়া পশুর মাংস ভাগ তৈরি করে বিকেলের মধ্যে বিতরণ শেষ করা হয়। দেড়শ বছরের পুরনো এই রীতি বাবার হাত হয়ে এখন মাংস বিতরণের দায়িত্ব পালন করছেন তাদেরই সন্তানেরা।

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এটি গ্রামের বহু পুরনো প্রথা। এখানে একদল স্বেচ্ছাসেবক স্বেচ্ছায় পুরো কাজটি পরিচালনা করে। শুরুতে তালিকা তৈরি ও তালিকা অনুযায়ী ঈদের আগের দিন প্রত্যেকের বাড়িতে ঘরে ঘরে টোকেন পৌঁছে দেওয়া হয়।ঈদের দিন দুপুর থেকে গ্রামের মানুষ জনের কোরবানি করা মাংস ঈদগাহ মাঠে আসতে থাকে। পরে স্বেচ্ছাসেবকরা মিলে সেই জমাকৃত মাংস বন্টন শুরু করেন। আর বন্টনকৃত মাংস টোকেন জমা রেখে বিকেলের মধ্যে বিতরণ শেষ করা হয়। তবে যেহেতু এটা কোরবানির ঈদ তাই গ্রামের বিধবা ও প্রতিবন্ধিদের জন্যও রাখা হয় বরাদ্দ। বহু পুরনো এই প্রথাটি এই গ্রামের দেখা দেখি এখন অনেকেই পালন করছেন বলেও জানান আয়োজকরা।

কলেজ শিক্ষার্থী ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামের ইমন মিয়া বলেন, আমরা স্বেচ্ছায় ৭ বন্ধু মিলে সামাজিক এই মাংস বন্টনের কাজ করছি। বন্টন শেষে এলাকার মুরুব্বি ও বড় ভাইদের সহযোগীতায় গ্রামের সবাইকে মাংস বিতরণ করা হয়। দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা কাজটি আমাদের সমাজের একটি সামাজিক বন্ধন। এইদিন সবাই এক সাথে হয়। আর সবাইকে এক সাথে পেয়ে খুব ভালো লাগে। এক সময় আমাদের বড় ভাইরা এই দায়িত্ব পালন করতো, আর এখন সেই দায়িত্ব আমাদের হাতে। একদিন হয়তো একই দায়িত্ব আমাদের ছোট ভাইরা পালন করবে।

আরও জানা যায়, ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামে যারা পশু কোরবানি দেন, তারা প্রতিটি পশুর মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ জমা দেন এই সামাজিক ভাগ-বণ্টনে। এই সমাজভুক্ত প্রত্যেকের বাড়ির জন্য একজন করে ভাগীদার ধরে মাংস ভাগ করা হয়। এবার প্রায় তিনশ ভাগ করা হয়েছে সামাজিক কোরবানির মাংস। স্থানীয় মসজিদ থেকে মাইকিং করে আওতাভুক্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের ডেকে এনে মাংস বিতরণ করা হয়।

ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি রফিজ উদ্দিন জানান, বাংলাদেশে অনেক গ্রাম আছে, যেখানে কোরবানি হয় মসজিদ কমিটির মাধ্যমে। কোরবানির মাংস যাতে সমাজের সবার ঘরে পৌঁছায়, সে জন্য কোরবানির মাংস তিন ভাগের এক ভাগ মসজিদ চত্ত্বরে জমা করতে বলা হয়। জমাকৃত মাংস মসজিদের আওতাভুক্ত প্রতিটি পরিবারকে একক ধরে ভাগ করা হয়। ধনী-গরিব সবাই সমান হারে ভাগ পায়। এই নিয়মে কোরবানির মাংস বণ্টন করার ফলে কোরবানির দিন কেউ মাংস থেকে বাদ যায় না।

তিনি আরো বলেন, এক সময় আমাদের বাপ-চাচারা এই দায়িত্ব পালন করতো। তাদের হাত ধরে আমরা করেছি। এখন সামাজিক এই মাংস বিতরণের দায়িত্ব পালন করছে আমাদেরই ভাই-ভাতিজারা। একদিন তাদের হাত ধরে আরেক প্রজন্ম পালন করবে বহু বছরের পুরনো এই প্রথাটি। এইভাবে প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এই রীতি আমরা টিকিয়ে রেখেছি।এটা একটা সামাজিক রীতি। অনেকটা মিলন মেলাও বলা চলে।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, এই রীতিটি আমাকে মুগ্ধ করেছে। তবে হালে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভাগ হয়ে ছোট পরিবার হয়ে যাওয়ায় সামাজিক কোরবানির এই মাংস ভাগের প্রথা দিন দিন কমে আসছে। সেই ক্ষেত্রে ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রাম মুরুব্বি, তরুণ-যুবকরা এই প্রথাটিকে টিকিয়ে রেখেছে যা সত্যি প্রশংসার দাবিদার।

ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা মো. ছাফায়েত উল্লাহ জানান, কোরআন হাদিসের আলোকে সামাজিক এই রীতিটি সত্যি অন্যরকম। এখানে ধনী-গরীব সবার মাঝে সমানভাবে মাংস বিতরণ করা হয়। তাছাড়া প্রতিবন্ধি ও বিধবাদের জন্যও রাখা হয় আলাদা বরাদ্দ। এই প্রথাটি প্রজন্মের হাত ধরে প্রজন্মে টিকে থাকুক এটাই প্রত্যাশা।


More News Of This Category
Theme Created By Tarunkantho.Com