Logo

সিরাজগঞ্জে করোনার প্রভাবে সংকটে তাঁতশিল্প; প্রসেস মিলের কার্যক্রমও বন্ধ

সেলিম রেজা, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ আগস্ট, ২০২১
করোনার প্রভাবে, চরম সংকটে, তাঁতশিল্প

তাঁতশিল্পের প্রধান উপকরণ সুতা পাকাকরণের প্রথম কাজটাই করা হয় প্রসেস মিলে। এ মিলের ব্যবসায় পুঁজি খাটিয়ে লাভবান হওয়া যাবে এমন স্বপ্ন নিয়েই তাঁতশিল্প অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রামে বিদেশফেরত এক ব্যক্তি ৩ বছর আগে মামা ভাগ্নে প্রসেস মিল’ গড়ে তোলেন। কিছুদিন যাবার পরই রং, সুতা ও কেমিক্যালের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রথম ধাক্কা লাগে তার ব্যবসায়। মহামারি করোনার প্রভাবে তাঁত কারখানা বন্ধ থাকায় প্রসেস মিলের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় স্বপ্নের প্রসেস মিলটি স্থায়ীভাবে বন্ধের আশংকায় ভুগছেন মিল মালিক হাজী নান্নু।

তার কারখানায় বসেই এ প্রতিনিধির কথা হয়। কেমন আছেন’ জানতে চাওয়ায় শুরুতেই বলে উঠেন, কেমন আর থাকা যায় বলুন, একসময় তাঁত মালিকদের সুতায় ঘর বোঝাই থাকতো। এখন করোনার প্রভাবে তাঁত কারখানা বন্ধ থাকায় তাঁত মালিকের আশায় বসে থাকলেও সুতা প্রসেস করাতে কেউ আসে না।

তিনি বলেন, কোরবানি ঈদের পর মিল খুলে সুতা প্রসেস করার যে অর্ডার পেয়েছি, তাতে মাত্র ১৬ জন শ্রমিক ৩দিন কাজ করতে পারবে, এরপর আবার নতুন অর্ডারের আশায় বসে থাকতে হবে।

মিল মালিক নান্নু বলেন, মিলে সুতার আমদানি কম থাকায় করোনার শুরু থেকে গত রোজার ঈদ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে ৩দিন করে মিল চালু রাখতাম। এরপর টানা দুই মাস বন্ধ থাকার পর কোরবানী ঈদের আগে মাত্র কয়েক দিন খোলা ছিল।

মিলটিতে ২জন স্টাফসহ কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৩০জন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিজের ও শ্রমিকদের পরিবার পরিজনের ভবিষ্যত নিয়ে নানা শংকার কথা জানিয়ে হাজী নান্নু বলেন, গ্রামের ধনীবিল এলাকায় নিজস্ব জায়গায় মিলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৫ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে মিলের স্থাপনা নির্মাণ এবং কেমিক্যালের বাকি মিলে ৩ বছর আগে অন্যের কাছে দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ টাকা। আর তাঁত মালিকদের কাছে পাওয়া যাবে ১৫ লাখ টাকা। ব্যবসা বন্ধ থাকায় তাঁত মালিকরা যেমন আমাকে টাকা দিচ্ছে না, তেমনি আমিও দেনা পরিশোধের কোন উপায় খুজে পাচ্ছি না।

বাজার থেকে ক্রয় করা সাদা রংয়ের কাচা সুতা প্রথমে আসে প্রসেস মিলে। সেখানে কেমিক্যাল মিশিয়ে ও বয়লারে সিদ্ধ করে সেটি পাকা করা হয়। এরপর তাঁত মালিকরা বাড়িতে নিয়ে সুতায় চাহিদামত রং করে নেন। আবারও চুলায় সিদ্ধ করে সুতায় দেয়া রং পাকা করা হয়। তারপর সেই সুতায় তৈরী হয় শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছা। পুরো তামাই গ্রামে এমন প্রসেস মিলের সংখ্যা ৪টি। আর বেলকুচি উপজেলায় ছোট-বড় মিলে অন্তত ৫০টি প্রসেস মিল রয়েছে। প্রত্যেকটির অবস্থা এমনই নাজুক বলে জানা গেছে।

মিলের ম্যানেজার সাজিদ মুসুল্লী জানান, দীর্ঘদিন হলো রং, সুতা ও কেমিক্যালের বাজার চড়া। কোরবানীর ঈদের পর এসব পণ্যের দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। করোনার প্রভাবে কাপড়ের হাটগুলো বন্ধ। উৎপাদিত তাঁতপণ্যও বিক্রি হচ্ছে না। এ অবস্থায় অধিকাংশ মালিকরা তাঁত কারখানা বন্ধ রেখেছেন। তাই সুতা প্রসেসের প্রয়োজন কমে যাওয়ায় আমাদের মিলও চলছে না। রোজগার না থাকায় ধারদেনায় সংসার চালাতে হচ্ছে।

মিলের সহকারী ম্যানেজার রওশন আলী মীর বলেন, ২০ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে তাঁত কারখানা করেছিলাম। রং, সুতা ও কেমিক্যালের মৃল্যবৃদ্ধি এবং তাঁত পণ্যের বাজার মন্দা হওয়ায় কয়েক বছরের ব্যবধানে বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। এখন দিন হাজিরায় এই মিলে কাজ নিয়েছি। এটিও বন্ধের পথে। ৩ মেয়ে, ১ ছেলে ও স্বামী-স্ত্রী মিলে ৬ জনের সংসার, কেমন করে চলবে সে চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না।

এনজিও এবং দোকানগুলোতে দেনার পরিমাণ ক্রমশ বাড়ার কথা জানিয়ে মিলের শ্রমিক শুকুর আলী জানান, মিলে কাজ হলে সপ্তাহে ২ হাজার টাকা আয় হয়। আর মিল বন্ধ থাকলে বেকার থাকি। তাঁতশিল্প অধ্যুষিত এ অঞ্চলে অন্য কোন কাজের ব্যবস্থাও নেই। সংসার তো আর বসে থাকে না।

মিলের শ্রমিক কামারখন্দ উপজেলার বাশারিয়া গ্রামের শাহজামাল মিয়া বলেন, মিলে কাজ না থাকায় প্রায় লাখ টাকার দেনা হয়েছে। অন্য কাজও নেই, তাই পেশাও বদলাতে পারছি না


More News Of This Category
Theme Created By Tarunkantho.Com