Logo

দাম্পত্য সুখের জন্য “দাম্পত্য রসায়ন”

মোহাম্মদ রায়হান,শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী।
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ আগস্ট, ২০২১

দাম্পত্য রসায়ন- বিখ্যাত মার্কিন লেখক এবং ইসলামি চিন্তাবিদ ইয়াসির ক্বাদিরের বিখ্যাত একটি গ্রন্থ। ইংরেজি ভাষা থেকে অনুবাদ করে বাঙলা ভূখন্ডের জন্য সাবলীল ভাবে বইটিকে উপস্থাপন করেছেন লেখিকা ফাতেমা মাহফুজ। বইটি পড়লে যে কেও খুব সহজেই একই সাথে লেখক এবং অনুবাদকের জ্ঞানের পরিধি আঁচ করতে পারে। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবন এবং ইসলাম কে গভীরভাবে সংযোগ করার অবিজ্ঞতা লেখকের অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করে।

দাম্পত্য রসায়ন বই টি ১২টি অধ্যায়ে বিভক্ত। তবে এ বই কে ৩টি বিশেষ প্রয়োজন হিসেবে ভাগ করা যায়-
১.ইসলামে রোমান্টিকতার স্থান
২.দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী মাঝে জৈবিক ক্রিয়ার প্রভাবক এই বই
২. দাম্পত্য জীবনে স্বামী এবং স্ত্রী’র একে অপরের প্রতি দায়-দায়িত্ব।

বই এর শুরুতেই কোরআনের আয়াত দিয়ে শুরু করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, “তোমাদের স্ত্রী রা তোমাদের পোষাক, আর তোমরা স্ত্রী দের পোষাক”। বলতে গেলে পুরো বই ই উক্ত আয়াতের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। নানান দিক-কোন থেকে এই হাদিসের ব্যাখা দাঁড় করিয়ে পাঠকদের এই বুঝানো হচ্ছে,তোমারা একই দেহের অঙ্গের মতোই। এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দৃশ্যমান সম্পর্ক ছাড়াও রয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে অন্য এক সম্পর্ক। যে সম্পর্কের মাঝে আছে প্রেম, আছে রোমান্টিকতা, আছে একে অপরের প্রতি যৌন-আবদার।

সচরাচর যৌনতা কে সমাজের মানুষ অশালীন বলে ধরে নিলেও এই বইয়ে যৌনতাকে বেশ খোলামেলা এবং পবিত্র বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, যৌনতায় অবশ্যই থাকতে হবে একটা পবিত্র সম্পর্ক। যে সম্পর্কে আল্লাহর রহমত এবং বরকত থাকে। একটা হালাল সম্পর্কের পরে আসে চাহিদামাফিক একজন সঙ্গী। বই এ রসূল (সাঃ) তার সাহাবী জাবির কে কুমারী নারীকে সঙ্গী হিসেবে নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করেন ।কেননা, একজন কুমারী নারী রীতিমতোই আবেদনময়ী এবং কামুকতায় পূর্ণ থাকে। জৈবিক কাজে দারুন সাড়া দিতে পারে। রসূল (সাঃ) স্বয়ং জাবিরকে খোলামেলা ভাবেই দাম্পত্য সুখের নানান ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছেন। দাম্পত্য জীবনে রোমান্টিকতা, কামুক ভাব নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর একে অপরকে একে অপরের সামনে উপস্থাপন করার ব্যাপারেও নির্দেশনা দিয়েছেন।লক্ষনীয়, সাহাবী জাবিরের পুরো মানবজাতির প্রতিনিধিত্ব করে। এবং রসূল (সাঃ) এর হাদিসের আলোকে ইসলামে রোমান্টিকতার জায়গা কে পরিষ্কার ভাবে চিহ্নিত করে গিয়েছে সে।

নব বিবাহিত জুগলের জন্য এই বই “বাইবেল” হিসেবে কাজ করবে। দাম্পত্য জীবনে শুরু থেকে শেষ অবদি সুখী হওয়ার জন্য এমনকি ইহকালীন এবং পরকালীন কল্যানের নিমিত্তে করণীয় সম্পর্কে বেশ সুশৃঙ্খল ভাবে আলোচনা করা হয়েছে এখানে।

বৈবাহিক জীবনে “স্বামী-স্ত্রীর” সর্বাধিক সুখ লাভের পন্থা হিসেবে সাবলিল ভাষায় এই বই থেকে বেশ কয়েকটি বিষয় কে তুলে আনা যায়-

১। বিয়ে করুন তরুন-তরুনী”বয়সীদের
২।স্বামীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে যৌন অঙ্গের প্রতি যত্নবান হোন।
৩। স্বামীর ‘হুটহাট’ যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রতি স্ত্রী কে সচেতন হতে হবে, স্ত্রী’র ধীরে সুস্থে যৌনচাহিদা বাড়ার ব্যাপারে স্বামীকে বুঝতে হবে
৪। সরাসরি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ যে, যৌন কর্মের ক্ষেত্রে মলদ্বার পরিহার কর।
৫। দুগ্ধদানকারী স্ত্রীর সাথে সহবাস করা যাবে
৬। পারস্পরিক সমঝোতা না থাকলে দাম্পত্য জীবন সুখের হতে পারে না
৭। একজন স্বামী হওয়ার পর নারীর চোখে একজন “বিশ্বস্ত পুরুষ” হোন।
৮। একে অপরের সুনাম করতে শিখুন। বিশেষ করে স্ত্রী কেবল স্বামীর জন্য সাজুগুজু কিংবা বিশেষ রান্না করলে আপনার মনপুত না হলেও সুনাম করুন। এতে স্ত্রী খুশি হবে।
৯। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য দুজনকে সাময়িক তবে বেশী সময়ের জন্য আলাদা করে ফলার উপক্রম হলে দুজনের সমঝোতার মাধ্যমে সেই সংকটাপন্ন মুহুর্ত কে অতিক্রম করতে হবে। তবে দুজন সাময়িক রাগের বশবর্তী হয়ে আলাদা হলে এটা ভাবা চলবে না যে, “দুজন দুজনকে ভালোবাসে না”।

একদিক দিয়ে বইটি অধ্যয়নে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অন্তরঙ্গতা বৃদ্ধি পাবে, আরেক দিক দিয়ে প্রত্যেকে সচেতন হবে যে, তার স্ত্রী কে বা স্বামী কে কিভাবে খুশি রাখা যায়, কিভাবে সুখে রাখা যায়।

বইটি কেন এবং কারা পড়বেন?

“দাম্পত্য রসায়ন” নামকরণই বুঝিয়ে দেয় এই বই দাম্পত্য জীবনের রসবোধের ব্যাপারে শিক্ষা দেয়। দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে বইটি বিশেষ নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে যারা বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে একদমই উদাসীন, এই বইটি তাদের জন্য বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। এবং অবশ্য পাঠ্য বলা যায়। নবদম্পতিদের মনে রসবোধ কে বাড়িয়ে তোলার জন্য এই বই টি মনোযোগ সহকারে তাদের অধ্যয়ন করা উচিত। আর, এ বইটি কেবল বিবাহিত নয়, বরং সব বয়সী পাঠকদের জন্য উপযোগী এবং মেডিসিন স্বরুপ।

“যৌন অন্তরঙ্গতা হচ্ছে বৈবাহিক জীবনে প্রতিদিনকার বিবাদ কাটিয়ে উঠার সবচেয়ে সহজ পন্থা”- বইয়ের শেষে লেখকের সর্বপ্রথম উপদেশ এটি। যার মাধ্যমে লেখক আবারো বুঝাতে চাচ্ছেন, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যৌন সম্পর্ক একই সাথে ভালোবাসা এবং দুজনের বাহ্যিক(যৌন চাহিদার বাহিরে) চাহিদার স্থানটি পূর্ণ করে। দাম্পত্য রসায়নে লেখক সর্বশেষ একটা চমৎকার ‘শেষ’ দিয়েছেন। এমনকি পাঠকদের জন্য বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখে কয়েকটি উপদেশ দিয়ে গেছেন, যা প্রকারান্তরে এই বই এর স্বারমর্ম হিসেবে দারুন উপযোগী।

“দাম্পত্য রসায়ন” নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে প্রণিত একটি নির্দেশনামা, যা পরবর্তী প্রজন্মের পাঠকদের জ্ঞানচাহিদার কে মিটিয়ে আত্মার খোরাক হিসেবে কাজ করবে।


More News Of This Category
Theme Created By Tarunkantho.Com