Logo

প্রভাবশালীর হাতে প্রতিবন্ধী শিক্ষক লাঞ্চিত!

মাহফুজুর রহমান, কালীগঞ্জ, গাজীপুর
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২১
প্রভাবশালী হাতে প্রতিবন্ধী শিক্ষক লাঞ্চিত!

গাজীপুরের কালীগঞ্জে মো: হাফিজুল্লাহ (৩৮) নামের শারীরিক প্রতিবন্ধী এক শিক্ষককে চড়, থাপ্পড় ও জুতাপেটা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

সোমবার (১৫ নভেম্বর) দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মারধরের শিকার ওই শিক্ষক।

শারীরিক প্রতিবন্ধী ওই শিক্ষক উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের ভাটিরা গ্রামের মৃত মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৫ সালে বিএ অনার্স ও ২০০৬ সালে আরবি বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী কোটায় নিয়োগ পেয়ে প্রথমে নরসিংদী সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পরে ২০১২ সালের ২৯ মে কালীগঞ্জ আর.আর.এন পাইলট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (ইসলামীয়াত) হিসেবে অদ্যাবধি কর্মরত আছেন।

অন্যদিকে, অভিযুক্তরা হলেন কালীগঞ্জ পৌর এলাকার গোলাবাড়ি গ্রামের মৃত এলাহি মুন্সির ছেলে আওলাদ মোল্লা (৫২), মৃত বরকত উল্লাহ’র ছেলে বাতেন মোল্লা (৪৫), মৃত মমিন উদ্দিনের ছেলে মোশারফ হোসেন শুক্কুর (৪৬)। শুক্কুর কালীগঞ্জ উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় তার একচ্ছত্র আধিপত্যে বাকীরাও প্রভাবশালী এবং বেপরোয়া।

শিক্ষক হাফিজুল্লাহ জানান, তারা ৪ ভাই ও ২ বোন। ২০০৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী তাঁর বাবা মারা যান। বোনদের বিয়ে হয়ে গেলেও বাবার মৃত্যুর পর ৪ ভাই পৃথকভাবে জীবন যাপন শুরু করেন। মা গ্রামে তাঁর তৈরি করা বাড়িতে থাকেন। আর তিনি চাকুরীর সুবাদে বর্তমানে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে স্কুলের কোয়াটারে বসবাস করেন। গত ৩০ অক্টোবর রাত ১২টার দিকে কোয়াটারের পিছনের গেইট দিয়ে থানা পুলিশ হানা দেয়।

ওই সময় তিনি ঘুমিয়ে থাকলেও টের পেয়ে ভীত হয়ে পড়েন। পরে তিনি কোয়াটারে বসবাসরত অন্য সহকর্মীদের ডেকে তুলেন এবং তাদের সহযোগীতায় পুলিশের সাথে কথা বলেন। এ সময় পুলিশ জানায় তাঁর ছোট ভাই আমানউল্লাহ’র সাথে আওলাদ মোল্লার ভাতিজী ও বাতের মোল্লার ছোট বোনের সাথে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে।

এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ হয়েছে। এ কারণে তাকে ওসি থানায় দেখা করতে বলেছে। তিনি রাতেই বিদ্যালয়ের দুই সহকর্মীকে সাথে নিয়ে ওসি’র সাথে দেখা করেন। পরে ওসি ওই শিক্ষককে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে তাঁর ভাইকে হাজির করতে বলে। কিন্তু তিনি তার ছোট ভাইয়ের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধীকবার ফোন দিয়েও তা বন্ধ পান। পরদিন ৩১ অক্টোবর সকালে ওসিকে বিষয়টি জানাতে গেলে তিনি রেগে যান এবং ওই মেয়েকে তাঁর বাড়িতে তুলে দিবেন বলে জানান।

তিনি আরো বলেন, ওইদিন অভিযুক্তরা আমাকে থানা থেকে জোর করে গাড়িতে উঠিয়ে গোলাবাড়ি নিয়ে যায়। অন্যের দোষ আমার ভাইয়ের উপর দিয়ে আমাকে কেন নির্যাতন করছেন? এমন প্রতিবাদ করলে অভিযুক্তরা আমাকে চড়, থাপ্পড় ও জুতাপেটা করেন। পরে সেখান থেকে দুপুর দেড়টার দিকে ওসির নির্দেশে অভিযুক্তদের নেতৃত্বে ভাটিরা গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে আমানউল্লাহর কোন ঘর না থাকায় আমার তৈরি করা ঘরে ওই মেয়ে ও তার মাকে উঠিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া তাদের ভরণপোষণ দিতে আমাকে বাধ্য করা হচ্ছে। আমি শারীরিক প্রতিবন্ধী বলে তাদের ভয়ে এখনো পর্যন্ত ভরণপোষণ দিয়ে যাচ্ছি।

কান্না জড়িত কণ্ঠে প্রতিবন্ধী ওই শিক্ষক বলেন, আমার ভাই কোন অপরাধ করে থাকলে দেশের প্রচলিত আইনানুসারে তাকে শাস্তি প্রদান করুক। কিন্তু ছোট ভাইয়ের অপরাধে আমাকে কেন শারীরিক ও মানসিকভাবে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আমার কি অপরাধ? অভিযুক্তরা মোবাইল ফোনে, সরাসরি নানাভাবে আমাকে মামলা ও প্রাণ নাশের হুমকি দিচ্ছে। তারা আমার ঘর-বাড়ি দখল করে রেখেছে। আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। অন্য আর দশজনের মতো আমার জীবন না। এ ব্যাপারে আমি স্থানীয় সাংসদ ও প্রশাসনের হস্থক্ষেপ কামনা করি। তারা যেন আমাকে শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন না করে এবং আমার দখলকৃত ঘর-বাড়ি ফিরিয়ে দেয়।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আওলাদ মোল্লা বলেন, চড়, থাপ্পড় ও জুতাপেটার ঘটনা সত্য নয় ভিত্তিহীন। অপরাধ করেছে শিক্ষকের ভাই আমরা তাকে কেন মারবো? তবে আমানউল্লার ঘর না থাকার কারণে ওসির নির্দেশে আমরা মেয়ে ও তার মাকে ওই শিক্ষকের ঘরে তুলে দিয়েছি।

অভিযুক্ত মোশারফ হোসেন শুক্কুর বলেন, আওলাদ মোল্লা আমাকে ঘটনা জানানোর পর আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি মীমাংসার স্বার্থে শিক্ষককে শুধু ধমক দিয়েছি। তবে ওই শিক্ষক খারাপ লোক।

কালীগঞ্জ থানা অফিসার ইনচার্জ মো. আনিসুর রহমান বলেন, এ ব্যাপারে থানায় একটি অভিযোগ পেয়ে শিক্ষককে ডেকে এনে তাঁর ভাইয়ের খোঁজ করতে বলেছি। এর পরে কি হয়েছে আমার জানা নেই।


More News Of This Category
Theme Created By Tarunkantho.Com