রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১১:০৯ পূর্বাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি:
অনলাইন নিউজ পোর্টাল “আজকের তরুণকণ্ঠে” জেলা, উপজেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে সাংবাদিক/প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা  ইমেইলে (newstarunkantho@gmail.com)জীবন বৃত্তান্তসহ পাসপোর্ট সাইজের ছবি ও জাতীয় পরিচয় পত্র সংযুক্ত করে পাঠাতে পারেন।

গ্রীষ্মের আগেই পাহাড়ে পানির তীব্র সংকট

তরুণকণ্ঠ ডেস্ক
প্রকাশ : বুধবার, ২০ মার্চ, ২০২৪, ১:৩০ অপরাহ্ন
পাহাড়ে পানির তীব্র সংকট

আবুবকর ছিদ্দীক, বান্দরবান প্রতিনিধি:

পাহাড়ে প্রায় সবকটি পানির উৎস ঝিরি-ঝর্ণাগুলো শুকিয়ে গেছে। অনেক গ্রামে ঝিরির একেবারে শেষ মাথায় পাথরের গর্তে অল্প পানি জমে আছে। সে পানিকে ৪-৫ হাজার ফুট দূরত্ব থেকে জিএফএস পাইপের মাধ্যমে নিয়ে এসে পাড়ার পাশে প্রায় ৩০০ ফুট নিচে ঝিরিতে ড্রাম বসিয়ে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সেখান থেকেই এখন পাড়াবাসী ও নারীরা পানি সংগ্রহ করছেন।

বান্দরবান জেলা শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে ম্রলং পাড়ায় গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়।

এটি শুধু ম্রলং পাড়া দৃশ্য নয়। বান্দরবান-রুমা-থানচি রোডে চিম্বুক পাহাড় রেঞ্জ এলাকার মেনলুং পাড়া, বাগান পাড়া, রামারি পাড়া, রিয়ামনই পাড়া, মেনসিং পাড়া, ক্রাপু পাড়া, দলিয়াম পাড়া, এনরা পাড়া, বাবলা হ‍েডম‍্যান পাড়া, পাতুই পাড়া, বসন্ত পাড়াসহ মোট ২৮টি পাড়ায় অন্তত ৮০০ ম্রো পরিবারের প্রায় ২ হাজার মানুষ পানি সংকটে।

এ ম্রলং পাড়ায় ২৮টি পরিবারের ম্রো জনগোষ্ঠীর বসবাস। প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত, অর্থাৎ বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত পানির তীব্র সংকটে থাকেন পাড়ার সবাই।

পাড়ার ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মেনয়ুন ম্রো বলেন, আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং সংসার সবি এই গ্রামে। আমার এই ৬৫ বছর বয়সে পানির সংকট আগে দেখিনি। গত বছরের মত এবছরেও পানির সংকট শুরু হয়ে গেছে। পানি না থাকলে আমরা কোথায় যাবো। পানির অভাবে আমাদের মরতে হবে।

এখনো শুষ্ক মৌসুম পুরোপুরি শুরু হয় নাই, এখন থেকেই পাড়ার নারীদের অন্যান্য কাজ বাদ দিয়ে শুধু পানি সংগ্রহ করতেই দিনের অধিকাংশ সময় চলে যায়। সংগৃহীত পানি বড়জোর একমাস ব্যবহার করতে পারবে বলে জানিয়েছেন এ পাড়ার বাসিন্দারা।

আরেক বসন্ত পাড়ার বয়োঃবৃদ্ধ মেননু ম্রো (৬২) বলেন, মার্চের শুরু থেকেই আমাদের পানি সংকট শুরু হয়। পানির অভাব থাকায় শুষ্ক মৌসুমের ২-৩ মাস নিয়মিত গোসল করা যায় না। যারা জুমের কাজে যায়, তারা যেখানে পানি পায় সেখানেই গোসল করে বাড়িতে ফেরে। কোথাও পানি না পেলে সারাদিন পরিশ্রমের পর ঘামে ভেজা শরীর নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়। এই অবস্থা চলতে থাকলে পানির সংকটের কারণে অন্য কোথাও চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। গত বছর আমাদের পাড়াসহ চিম্বুক পাহাড়ে বিভিন্ন পাড়ার পানির সংকটের কথা শুনে সাবেক ডিসি ইয়াসমীন পারভীন তিবরীজি এসে একটা বাঁধ দেওয়ার কথা বলে ছিলেন। তখন উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা এসে বাঁধের জন্য জায়গা পর্যন্ত মেপে গেছেন। বছর চলে গেলো, কোনো খবর নেই বলেও অভিযোগ তুলেন পাড়াবাসীরা।

ম্রলং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাংয়ং ম্রো বলেন, পানির সংকটের কারণে স্কুলে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী ও পাড়ার শিশুরা স্কুল ছুটির পর ঠিকভাবে গোসল করতে পারছে না। ফলে বাচ্চারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বান্দরবান-চিম্বুক রোডের ৬ মাইল এলাকার বেথানী পাড়ার ক্লারিস বম বলেন, আমরা এখন পানির চরম সংকটে রয়েছি। খাবারের পানি সংগ্রহ ও গোসলের জন্য এক-দেড় ঘণ্টার পথ ধরে পাহাড়ের অনেক নিচে ঝিরিতে নামতে হয় । প্রতিদিন পানীয় জল তথা বিশুদ্ধ পানি কিনে খেতে হচ্ছে । আমাদের বেঁচে থাকার জন্য এটা অত্যন্ত ব্যয় বহুল। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় দেখছি না।

আর এক গৃহিনী লাল রোয়াত সিয়াম বলেন, মার্চের মাঝামাঝি আসলেই পানির কষ্ট তীব্রতা শুরু হয়। তখন নিরুপায় হয়ে নিজের দায়িত্বে পানি ভরে ৭০০ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে শৈলপ্রপাতে ঝিরির পানি আনতে হয়। দেড় কিলোমিটার দুরত্বে গিয়ে গোসল করতে হয়।

এদিকে জেলা সদর উপজেলার ২নং কুয়াহালং ইউনিয়নের গুংগুরু আগা পাড়ায় গিয়ে পানির তীব্র সংকটের চিত্র দেখা গেছে, পাড়ায় ১৮টি পরিবার বসবাস। পাড়াবাসী ম্যুইসাপ্রু, সাহ্লাচিং, অংসাহ্লা খেয়াং এর সাথে কথা হলে তারা জানান, পাড়ায় একটি মাত্র নলকুপ উপরেই নির্ভরশীল পুরো পাড়াবাসী। সকাল থেকে খাবার পানি, গোসলসহ গৃহস্থালি সকল কাজের জন্য পানি সংগ্রহের দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পাড়ার আশেপাশে কোন ঝিরি-ঝর্ণা কিংবা পানির উৎস নেই। যা ছিলো সবি শুকিয়ে গেছে। প্রতিবছর মার্চে মাঝামাঝি আসলেই নলকূপ থেকেও আর পানি পাওয়া যায়না। পানির অভাবের কারণে পাড়ার পাশেই অনাবাদ অবস্থায় পড়ে আছে আবাদি ধানের জমি।

চিম্বুক পাহাড়ে ম্রলং পাড়ায় পানির সংকট সমাধানের জন্য বাঁধ নির্মাণের অগ্রগতি কিংবা ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান জেলা শাখা অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী অফিসে গিয়ে দেখা না পেয়ে মুঠো ফোনে একাঠিক বার যোগাযোগের জন্য কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপ কুমার দে জানান, পাহাড়ে অপরিকল্পিতভাবে ঝিরির পাশে তথা পানির উৎসের পাশে গাছ কেটে ফেলার কারণে ঝিড়ি ও ঝর্ণার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে পানির লেয়ার ও মাটির অনেক নিচে নেমে যাওয়া পাহাড়ে তাড়াতাড়ি পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া পাহাড়ের মাটির গর্ভে পাথর থাকায় গভীর নলকুপন বসানোর মত সুযোগ নেই। তবে, পাহাড়ের ঝিরিকে বাঁধ দিয়ে পানি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি।


এ সম্পর্কিত

Theme Created By ThemesDealer.Com