রবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি:
অনলাইন নিউজ পোর্টাল “আজকের তরুণকণ্ঠে” জেলা, উপজেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে সাংবাদিক/প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। আগ্রহীরা  ইমেইলে (newstarunkantho@gmail.com) জীবন বৃত্তান্তসহ পাসপোর্ট সাইজের ছবি ও জাতীয় পরিচয় পত্র সংযুক্ত করে পাঠাতে পারেন।

সিঙ্গাইরে বিলুপ্তির পথে টুল-পিঁড়িতে বসে চুল-দাড়ি কাটার দিন গুলো

তরুণকণ্ঠ ডেস্ক
প্রকাশ : শুক্রবার, ৫ জুলাই, ২০২৪, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

মো. সাদ্দাম হোসেন,স্টাফ রিপোর্টার:

যুগ বদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে সবখানেই। মানুষের আচার-আচরণ থেকে শুরু করে পুরোনো দিনের জীবনাচারণ ও ঐতিহ্যও বিলুপ্ত হচ্ছে। তেমনি কালক্রমে হারিয়ে যেতে বসেছে পিঁড়িতে বসে ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের সুনিপুণ হাতে চুল ও দাড়ি কাটার দৃশ্য। সময়ের আবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অন্য অনেক পেশার মতোই নরসুন্দরের এই পেশাও বদলে যাচ্ছে।

এক সময় গ্রামগঞ্জের হাট বাজারে পিঁড়িতে বসে বৃদ্ধ,যুবক ও ছোট্ট বাচ্চাদের চুল কাটায় ব্যস্ত সময় পার করত নাপিত বা নর সুন্দররা। একটি কাঠের বাক্সে ক্ষুর, কাঁচি, চিরুনি, সাবান, ফিটকারি, পাউডার ও বসার জন্য থাকত জল চৌকি কিংবা পিঁড়ি। এগুলো দিয়ে মানুষকে বসিয়ে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে মাথাকে দুই হাঁটুর মাঝে ঢুকিয়ে পিতলের চিরুনি আর কাঁচি দিয়ে কাটতেন চুল। আশি নব্বইয়ের দশকে এভাবে পিঁড়িতে বসিয়ে গ্রামবাংলার মানুষের চুল-দাড়ি কাটার সেই পরিচিত দৃশ্য এখন আর সচরাচর চোখে পড়ে না।

সভ্যতার বির্বতনে মানব জীবনের গতিধারায় পরিবর্তন ও নতুনত্বের ছোঁয়াই জেন্টস পার্লারগুলোতে বাহারি রংঙের হেয়ার স্টাইলের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে হাট- বাজারে পিঁড়িতে বসা সেলুনগুলা। আধুনিতায় সেই সকল নরসুন্দরদের স্থান দখল করে নিয়েছে নামি দামি সেলুনগুলো।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে সিঙ্গাইর উপজেলার  ঐতিহ্যবাহী সিঙ্গাইর বাজারে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা যায়, হাটের বিভিন্ন স্থানে বসে চুল ও দাড়ি কাটার কাজ করছে নরসুন্দরদের কয়েকজন সদস্য। কাস্টমারদের পিঁড়ি বা টুলে বসিয়ে চুল ও দাড়ি কাটছেন তারা।

তালেবপুর ইউনিয়ন  থেকে হাটে আসা কামাল হোসেন আজকের তরুনকণ্ঠকে বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে হাটে এসে এই ভ্রাম্যমাণ নর সুন্দরদের কাছে চুল কাটাতাম। এখন আমি আমার সন্তানদের এনে চুল কাটাচ্ছি।‘আমি দিনমজুর মানুষ। সেলুনে চুল ও দাড়ি কাটাতে গেলে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা লাগে। আর এদের কাছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকায় চুল ও দাড়ি কাটানো যায়। সেলুন আর এদের কাজের মান প্রায় সমান।’

চুল কাটতে আসা মনিরুজ্জমান বলেন, আমাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষই ভ্রাম্যমাণ এই নরসুন্দরদের দিয়ে চুল-দাড়ি কাটান। তাদের কাছে অনেক কম টাকায় চুল-দাড়ি কাটানো যায়।

উপজেলার সিঙ্গাইর বাজারের নর সুন্দর গৌচন্দ্র শ্রী আজকের তরুনকণ্ঠকে বলেন,
৫০ বছর ধরে বাপ-দাদার এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছি। ২০-৩০ পয়সা থেকে চুল দাঁড়ি কাটার কাজ করছি। এখন আগের চেয়ে লোকজন কম হয় । হাট বাজারের আনাচে কানাচে সেলুন ও জেন্টস পার্লার গড়ে উঠেছে। সেখানে কাঁচির পরিবর্তে মেশিন দ্বারা চুল কাটায় মধ্য বয়স্করা পর্যন্ত সেখানেই চুল দাঁড়ি কাটতে ভীড় করেন। তারপরও আমাদের কাছে  সকল বয়সের নিম্ন আয়ের লোকজন আসে। আমরা ২০-৩০ টাকা সেভ করতে নিয়ে থাকি। আর চুল কাটতে ৫০-৬০ টাকা নেই। আমরা প্রতিদিন সিঙ্গাইর বাজারে খোলা আকাশের নিচে এই কাজ করি। প্রতিদিন যা ইনকাম করি তা দিয়ে কোনমতে চলছে সংসার। বৃহস্পতি ও রবিবার হাটের দিনে একটু বেশি কাজ হয়।

তিনি আরো বলেন, আমাদের কোন নির্দিষ্ট দোকান না থাকায় ঝর বৃদ্ধিতে ভিজতে হয়। আমাদের তো দোকান দেওয়ার মতো সেরকম সামর্থ্য নাই।যদি সরকার আমাদের দোকান করতে একটু সহযোগিতা করতেন তাহলে আমাদের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই হত।

নরসুন্দর বম্বল শীল,ভোলানাথ শীল, কালীপদ শীল, সোদিত কুমার শীল আজকের তরুনকণ্ঠকে বলেন,গ্রামীণ এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছি আমরা আর বাজারের ফুটপাতে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি একেকজন জীবনের প্রায় ৩০,৪০, ৫০,৬০ টি বছর। উপজেলার সিঙ্গাইর বাজারের ফুটপাতে পিঁড়িতে বসিয়ে তারা স্থানীয়দের চুল ও দাড়ি কাটেন, করান শেভও। যার আয় দিয়ে কোনোরকমে চলে তাদের সংসার।

তাদের কাছে চুল-দাড়ি কাটতে আসেন বিভিন্ন বয়সের লোকজন। এ কাজের জন্য তাদের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বলতে আছে চিরুনি, কাপড়, ছোট আয়না, ক্ষুর,শেভ ক্রিম,কাঁচি ও একটি টুল বা পিঁড়ি। তাদের কাছে ৫০ টাকায় চুল ও ২০-৩০ টাকায় দাড়ি কাটানো যায়। তারা  এ কাজ করে প্রতি হাটে ৪০০-৫০০ টাকার মতো আয় করেন। আবার কেউ কেউ ৭০০-৯০০ টাকা ও আয় করেন।এই পেশায় অনেকের ৫০ টি বছর ও অতিবাহিত হয়ে গেছে। এ সময়ে বাজারের চিত্র বদলে গেলেও বদলায়নি তাদের জীবন। স্বল্প আয়ের এই টাকা দিয়েই চলে তাদের পরিবার।


এ সম্পর্কিত

Theme Created By ThemesDealer.Com